মধুমাস এসে চলেও গেল। আমার বাসায়ও নানান রকম ফলের আমদানী দেখা যাচ্ছে। রুবাই আর বিদুষীও এই নিয়ে ব্যস্ত। রুবাই অবশ্য তার ফাইনাল পরীক্ষার জন্য বেশি নজর দিতে পারছে না। বিদুষীর পরীক্ষা শেষ।
সেদিন বাসায় ফিরে দেখলাম ভাই-বোন অনেক লিচু নিয়ে বসে আছে। বুঝলাম এখন লিচু পর্ব। জানলাম ওদের মা অনেক লিচু নিয়ে এসেছে।
‘কতো লিচু আনসে মা?’ জানতে চাইলাম।
‘আমি সব গুনি নাই, বাবা। তবে মজার একটা বিষয় লক্ষ করেছি।’ রুবাই বললো।
‘কী সেটা?”
“দেখলাম আমি যদি প্রতিবারে ২টা করে নেই তাহলে শেষমেষ ১টা থাকে।’
‘তো। এটাতো হতে পারে। তার মানে সেখানে বেজোড় সংখ্যক লিচু আছে।’
‘মজা তো এখোনো বলিনি বাবা। আমি যদি ৩টা করে নেই তাহলেও ১টা থাকে। ৪টা করে নিলেও একটা থেকে যায়। এমন কি ৫ টা বা ৬টা করে নিলেও একটা থাকছে।’
আমি দেখলাম রুবাই একটা মজার জিনিষ দেখেছে। এই নিয়ে ওর সঙ্গে আলাপ করা যায়। ওর কাছে জানতে চাইলাম না গুনে এ তথ্য থেকে কি বলা যাবে ওখানে কতোটা লিচু ছিল।
রুবাই জানালো সেটা মনে হয় সম্ভব। সে তার খাতা কলম নিয়ে বসে পড়লো। এই ফাকে আমি তোমাদের কিছু কথা বলে রাখি।
যখন আমরা কোন পূর্ণসংখ্যা থেকে অন্য একটি পূর্ণসংখ্যা একবার একবার করে কমাতে থাকি তখন সেটিকে বলে ভাগ করা। যদি সব শেষে কোন সংখ্যা না থাকে তাহলে আমরা বলি প্রথম সংখ্যাটি দ্বিতীয় সংখ্যা দ্বারা নি:শেষে বিভাজ্য। আর প্রথম সংখ্যাটিকে আমরা বলি দ্বিতীয় সংখ্যার গুণিতক। দ্বিতীয় সংখ্যা হল প্রথম সংখ্যার গুণনীয়ক।
যেমন আমরা যদি ৬টি লিচু থেকে প্রতিবারে ২টা করে নেই তাহলে তিনবারের মাথায় সব শেষ হয়ে যাবে। কাজে ৬ হল ২ এর গুণিতক এবং ২ হল ৬ এর গুণনীয়ক। একটি সংখ্যার কেবল একটি গুননীয়ক থাকে না। একাধিক থাকতে পারে। ৬টি লিচু থেকে যদি আমরা ৩টা করেও নেই তাহলেও কিন্ত শেষে কিছু থাকবে না। অর্থাৎ ৩ সংখ্যাটিও ৬ এর একটি গুণনীয়ক। এখন লিচু যদি ৬ এর থেকে ১টি বেশি থাকতো তাহলে সেখান থেকে ২ট বা ৩টি করে নিলে সবসময় ১টা থেকে যেত। তারমানে এভাবে আমরা রুবাই-এর সমস্যার সমাধান করতে পারি। আবার একটা জিনিষ খেয়াল করো ৬ না হয়ে যদি সংখ্যাটা ৬এর গুণিতক কোন সংখ্যা যেমন ১২, ১৮, ২৪ হয় তাহলেও কিন্তু ২ আর ৩ এর ব্যাপারটা সত্য হবে।
আমরা শুরু করেছি ৬ দিয়ে এবং ২ আর ৩ কে পেয়েছি। কিন্তু যদি আমরা শুরু করতাম ২ আর ৩ থেকে তাহলে আমরা কীভাবে ৬ এ পৌছাতাম?
সোজা। কারণ এখন আমরা জেনেছি ৬ হলো ২ এবং ৩ এর গুণিতক। যেহেতু দুইটি সংখ্যার গুণিতক। কাজে আমরা বলতে পারি সাধারণ গুনিতক। আর এটা আমরা বের করতে পারি ২ আর ৩ এর সব গুণিতক বের করে। সেই কাজটি আমরা করলাম নিচে।
| গুণিতক | ২ | ৩ |
| ১ | ২ | ৩ |
| ২ | ৪ | ৬ |
| ৩ | ৬ | ৯ |
| ৪ | ৮ | ১২ |
| ৫ | ১০ | ১৫ |
| ৬ | ১২ | ১৮ |
দেখা যাচ্ছে ২ এবং ৩ এর গুণিতকের তালিকায় ৬ রয়েছে দুইট কলামেই। তার মানে ৬ সংখ্যাটি ২ এবং ৩ সংখ্যা উভয়ের গুণিতক। আমরা অবশ্য দেখেছি ১২ সংখ্যাটিও উভয়ের গুণিতক। ৬ আর ১২ এর মধ্যে ৬ ছোট বা লঘিষ্ঠ। তারমানে দাড়ালো ২ এবং ৩-উভয়ের যত সাধারণ গুনিতক আছে তার মধ্যে ৬ সবার ছোট বা লঘিষ্ঠ। এজন্য ৬ কে বলা হয় ২ এবং ৩ এর লঘিস্ট সাধারণ গুনিতক! গণিতবিদরা সংক্ষেপে বলেন লসাগু।
এখন আমরা বুঝতে পারছি রুবাই-এর লিচুর সংখ্যা বের করার পদ্ধতি কেমন হবে। তাকে ২,৩,৪,৫ এবং ৬ এর লসাগু বের করতে হবে। দেখা যাক রুবাই কী করে।
রুবাই এর খাতাতে দেখলাম নিচের ছকটি
| গুণিতক | ২ | ৩ | ৪ | ৫ | ৬ |
| ১ | ২ | ৩ | ৪ | ৫ | ৬ |
| ২ | ৪ | ৬ | ৮ | ১০ | ১২ |
| ৩ | ৬ | ৯ | ১২ | ১৫ | ১৮ |
| ৪ | ৮ | ১২ | ১৬ | ২০ | ২৪ |
| ৫ | ১০ | ১৫ | ২০ | ২৫ | ৩০ |
| ৬ | ১২ | ১৮ | ২৪ | ৩০ | ৩৬ |
| ৭ | ১৪ | ২১ | ২৮ | ৩৫ | ৪২ |
| ৮ | ১৬ | ২৪ | ৩২ | ৪০ | ৪৮ |
| ৯ | ১৮ | ২৭ | ৩৬ | ৪৫ | ৫৪ |
| ১০ | ২০ | ৩০ | ৪০ | ৫০ | ৬০ |
| ১১ | ২২ | ৩৩ | ৪৪ | ৫৫ | ৬৬ |
| ১২ | ২৪ | ৩৬ | ৪৮ | ৬০ | ৭২ |
| ১৩ | ২৬ | ৩৯ | ৫২ | ৬৫ | ৭৮ |
| ১৪ | ২৮ | ৪২ | ৫৬ | ৭০ | ৮৪ |
| ১৫ | ৩০ | ৪৫ | ৬০ | ৭৫ | ৯০ |
| ১৬ | ৩২ | ৪৮ | ৬৪ | ৮০ | ৯৬ |
| ১৭ | ৩৪ | ৫১ | ৬৮ | ৮৫ | ১০২ |
| ১৮ | ৩৬ | ৫৪ | ৭২ | ৯০ | ১০৮ |
| ১৯ | ৩৮ | ৫৭ | ৭৬ | ৯৫ | ১১৪ |
| ২০ | ৪০ | ৬০ | ৮০ | ১০০ | ১২০ |
| ২১ | ৪২ | ৬৩ | ৮৪ | ১০৫ | ১২৬ |
| ২২ | ৪৪ | ৬৬ | ৮৮ | ১১০ | ১৩২ |
| ২৩ | ৪৬ | ৬৯ | ৯২ | ১১৫ | ১৩৮ |
| ২৪ | ৪৮ | ৭২ | ৯৬ | ১২০ | ১৪৪ |
| ২৫ | ৫০ | ৭৫ | ১০০ | ১২৫ | ১৫০ |
| ২৬ | ৫২ | ৭৮ | ১০৪ | ১৩০ | ১৫৬ |
| ২৭ | ৫৪ | ৮১ | ১০৮ | ১৩৫ | ১৬২ |
| ২৮ | ৫৬ | ৮৪ | ১১২ | ১৪০ | ১৬৮ |
| ২৯ | ৫৮ | ৮৭ | ১১৬ | ১৪৫ | ১৭৪ |
| ৩০ | ৬০ | ৯০ | ১২০ | ১৫০ | ১৮০ |
ভাল করে লক্ষ করলে দেখা যায় ৬০ সংখ্যাটি সব কলামে রয়েছে। অর্থাৎ ৬০ হলো ২,৩,৪,৫, ও ৬ এর লসাগু।
রুবাই-এর কাছে যদি লিচু থাকতো ৬০টি তাহলে সে প্রতিবার ২,৩,৪,৫ বা ৬টি করে নিলে শেষমেষ কিছুই থাকতো না। যেহেতু প্রতিবার একটি করে বেশি ছিল কাজে সংখ্যাটি হবে ৬০ থেকে ১ বেশি বা ৬১।
আবার আগের মতো দেখো ৬০ এর গুনিতক অর্থাত ৬০,১২০,১৮০ … ইত্যাদির জন্যও ব্যাপারটা সত্য হতো।
কাজে আমরা বলতে পারি রুবাই-এর মা কমপক্ষে ৬১টি লিচু এনেছে।
এভাবে লসাগু বের করতে অনেক সময় লগে। তবে, শুরুর দিকে এভাবে শিখলে তোমার জানা এবং বোঝার ব্যাপারটি অনেক সহজ হয়ে যাবে। এরপর তুমি ইউক্লিডের পদ্ধতিতে লসাগু বের করা শিখতে পারবে। রুবাইকে জানালাম।
‘তোমরা কী করছো’ কোন ফাঁকে দেখলাম বিদুষী এসে হাজির হয়েছে বাপ বেটার পড়ার টেবিলে।
‘আমি মা কয়টা লিচু এনেছিল সেটা বের করার চেষ্টা করছি।’ বোনকে জানালো রুবাই।
‘বা। আমাকে বললেই তো হতো। আমি তো মা আনার সঙ্গে সঙ্গে সব গুনে ফেলেছি।’
‘কয়টা ছিল?’
‘১২১ টা।’
Pingback: কোন লকার খোলা থাকবে? – Munir Hasan
চমৎকার উপস্হাাপন।
চমৎকার পদ্ধতি
Pingback: Munir Hasan | প্রাথমিক গণিতের কোর্স : লসাগু, গসাগু ও তাদের ইতিবৃত্ত
নতুন কিছু শিখলাম
খুব সুন্দর পাঠ উপস্থাপন করেছেন ।ধন্যবাদ ।