ইমোশনাল মার্কেটিং-কেস স্টাডি : ১ ডলারে ১০০ কোটি ডলার!

Spread the love

ইমোশনাল মার্কেটিং-১৩ : টার্গেট যখন নারী

বাবাকে দাড়ি কামাতে দেখে মনে হয় প্রথম দাড়ি কামানোর শখ হয় আমার। তবে, প্রথম শেভ করাইছি ক্লাস নাইনে, সেলুনে। তখনো বাসায় সেভ করার কথা মনে হয়নি বা সাহস হয়নি। জার্মানী থেকে ফেরার সময় বাবা একটা ইলেকট্রিক শেভিং মেশিনও কিনে এনেছিলেন। কিন্তু কখনো নিজে ব্যবহার করেননি। কাজে ওটার ব্যাপারেও আমার একটা লোভ তৈরি হয়। বাবার রেজরটা এমন ছিল যে, সেখানে নিয়মিত ব্লেড বদলানো লাগতো। আমার বুদ্ধির বয়সে বাবা সেভেন ও’ক্লক ব্লেড ব্যবহার করতেন। শেষ পর্যন্ত তাই করেছেন।

কিন্তু আমি যখন নিজে নিজে দাড়ি কামানোর হয়ে উঠলাম তখন আবিস্কার করলাম ওযানটাইম রেজর পাওয়া যায়। কয়েকবার ব্যবহার করা যায়, দামেও সস্তা। বুয়েটে পড়ার সময় বাড়ি গেলে আমি বাবার ইলেকট্রিকটা দিয়েও দাড়ি কামাতাম মাঝে মধ্যে। ওয়ানটাইম রেজরের পরে দেখা গেল আরও উন্নত রেজর পাওয়া যায়। চাকরি জীবনে এসে জিলেট কোম্পানির রেজরের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। বিদেশ থেকেও নানা রকম রেজর কিনে এনেছি। কিন্তু সেগুলোর কোনটাতেই স্থির হতে পারিনি। কারণ,  গালে ফোমটোম লাগিয়ে কাবার্ডের দরজা খুলে দেখলাম ব্লেড বদলানো হয়নি, স্টকে ব্লেড নাইও। বোঝেন অবস্থা। তারপর আবার হিসাব করে দেখলাম এ রেজরের দামও বেশি, হ্যাপাও বেশি। নিজের এই অভিজ্ঞতা আছে বলেই মার্ক লেভিন আর মাইকেল ডুবিনের আলাপের কথা শুনে আশ্চর্য হয়নি। ২০১০ সালে এক পার্টিতে এই দুই লোক মিলে রেজর নিয়ে তাদের দু:খের কথা অনেক আলাপ করেন। তাদের দু:খের কারণ আমার মতো দুইটা। রেজরের দাম আর ব্লেড বদলানোর কথা ভুলে যাওয়া। ডুবিন পরে বলেছেন – এক দুই সপ্তাহ পরপর দোকানে যাও রে, গাড়ি পার্ক করো রে, ঠিক ব্র্যান্ড আর মডেলের ব্লেড খুঁজে বের কর রে! সবই বিরক্তির চূড়ান্ত কিন্তু এর কোন সমাধানও নেই।

কাজে সায়েন্স ইনকরপোরেটেডের ইনকিউবেটরে তারা যে আইডিয়াটা নিয়ে যায় সেটি খুবই সহজ একটি চিন্তা। তাদের আইডিয়া হচ্ছে তাদের একটি অনলাইন শপ থাকবে যেখানে লোকে রেজিস্টার করে গ্রাহক হবে। আর তারা গ্রাহককে খুবই কম মূল্যে ডাকযোগে রেজর পাঠিয়ে দেবে। ডুবিনের এই আইডিয়ার পেছনে আর একটা প্রেরণা ছিল তার এক বন্ধুর বাবা। ঐ ভদ্রলোক বেশি রেজর বানিয়ে স্টকলট নিয়ে বিপদে পড়ে গিয়েছিলেন। অল্পদিনের মধ্যে তারা নিজেদের গুছিয়ে নেন এবং ২০১১ সালের জানুয়ারি মাসে কাজ শুরু করেন। এপ্রিলে তাদের ওয়েবসাইট লঞ্চ করা হয়। শপের নাম ডলার শেভ ক্লাব (https://www.dollarshaveclub.com/)। ডলার কেন? কারণ ওদের ভ্যানগার্ড প্রোডাক্ট ডাবল ব্লেডের রেজরের দাম হলো মাত্র ১ টাকা (ডলার)! তবে, এর সঙ্গে ২ টাকা আরও যোগ হবে শিপিং খরচ হিসাবে। আর ওদের কাজকারবার সবই হলো ডুবিনের এপার্টমেন্টে।

এপ্রিলে ওয়েবসাইট চালু হলেও তেমন গ্রাহক কিন্তু পাওয়া গেল না। টেকাটুকাও প্রায় শেষের দিকে। এরকম একটা কঠিন সমস্যার সমাধান করলাম কিন্তু কাজ হচ্ছে না কেন এটা ভাবতে গিয়ে ডুবিন বুঝলেন তাঁর প্রোডাক্টের খবর কেউ জানে না। তখনই তিনি ঠিক করলেন একটা ভিডিও বানাবেন, ব্যাখ্যা বা এক্সপ্লেইনার ভিডিও। না, ডুডল বা এনিমেশন দিয়ে করবেন না।
সিদ্ধান্ত নিলেন দুইটি – টাকা বাঁচানোর জন্য নিজেই হবেন মূল অভিনেতা, স্ক্রিপ্টটাও নিজে লিখবেন আর শুধু ক্যামেরা-ট্যামেরাগুলো হায়ার করবেন। মোট খরচ করলেন মাত্র চার হাজার ৫০০ ডলার!

ভিডিওর মূল অভিনেতা ও ব্যাখ্যাকার তিনি নিজেই। কাজটা করছেন নিজের পরিচয়ে। একটা ওয়্যারহাউসে তিনি হাটছেন আর হাসতে হাসতে সব কিছু ব্যাখ্যা করছেন।

“Are our blades any good?”
Dubin challenged viewers. “No. Our blades are f ***ing great!”

২০১২ এর মার্চের ৬ তারিখে ইউটিউবে সেই ভিডিও আপলোড হলো। ৬ ঘন্টার মধ্যে ট্রাফিকের চাপে তাদের ওয়েবসার্ভার ক্র্যাশ করলো। তারপর ২৪ ঘন্টা লাগলো সেটি রেস্টোর করতে আর ৪৮ ঘন্টায় নতুন গ্রাহক হলো ১২ হাজার! বন্ধুবান্ধব যোগাড় করে অর্ডার পাঠানো শুরু করলেন। এর কিছুদিন আগে এক মিলিয়ন ডলারের একটা ফান্ডিং তারা যোগাড় করেন। সেটি কাউকে বলেননি। যেদিন ভিডিও ছাড়লেন সেদিনই জানালোন ফান্ডিং-এর কথা। সেই ভিডিও লোকে এতো দেখতে শুরু করল যে, বিনিয়োগকারীরাও হুমড়ি খেয়ে পড়লো ডলার শেভ ক্লাবে। ছয় মাসের মধ্যে যোগাড় হলো ৯.৮ মিলিয়ন ডলার। খুশিতে ঠ্যালায় ২০১৪ সালে ডুবিন ঘোষণা করলেন পুরুষদের জন্য অন্যান্য টয়লেট্রিজও তারা বানাবেন ও পাঠাবেন। জুন ২০১৫তে ডি সিরিজে ৭৫ মিলিয়ন ডলার পাওয়া গেল। এর মধ্যে তরতর করে বাড়তে থাকলো তাদের ভ্যালুয়েশন আর শেষ পর্যন্ত মাত্র ১০০ কোটি ডলারে কোম্পানিকেই কিনে নিল ইউনিলিভার ২০১৬ সালের ১৯ জুলাই!

বর্তমানে ঐ কোম্পানির ৪ কোটি গ্রাহক আছে। তিনভাগের একভাগ গ্রাহক কমবেশি ৪ বছর সঙ্গে থাকে।
আর মজাদার, হিলারিয়াস ঐ ভিডিও এ পর্যন্ত ২ কোটি ৬০ লক্ষ বার দেখা হয়েছে!!!

এই ভিডিওটি কেন ম্যাসিভ হিট করেছে?

হিউমারাস, মজার বলে

ইন্টারনেটে এরকম হাজার হাজার ভিডিও আছে। কিন্তু ডলারেশেভের ভিডিওটি একটি গল্প বলেছে, সেটি মজার করে বলেছে এবং যা বলেছে সত্য বলেছে। এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের একটি সমস্যার সমাধান করেছে। অন্যদিকে এটি কেবল একটি ব্যাখ্যাশূলক ভিডিও হয়নি। এটি একই সঙ্গে হয়েছে মজাদারও। মার্কেটিং-এ ইমোশনের এমন চমৎকার প্রয়োগের উদাহরণ খুব কমই আছে।

 

 

One Reply to “ইমোশনাল মার্কেটিং-কেস স্টাডি : ১ ডলারে ১০০ কোটি ডলার!”

Leave a Reply