শুভ জন্মদিন বিডিওএসএন

Spread the love

আজ আমাদের প্রাণের সংঘটন বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্কের ১০ বছর পূর্ণ হল। সবাইকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা। দেখতে দেখতে আমাদের এই সংগঠনের এক দশক হয়ে গেল।  আজ একটা বার্থ ডে পার্টিও ছিল। এখন বসে শুরুর দিনগুলো মনে করলাম।

২০০৩ সালে জেনেভায় বিশ্ব নেতৃবৃন্দ একটি সামিটে যোগদেন। সেখানেই প্রথম তথ্যপ্রযুক্তির জীবন-ব্যাপী প্রভাবকে মেনে নেন বিশ্ব নেতৃবৃন্দ। জাতিসংঘের আয়োজনে এই উদ্যোগের নাম ছিল বিশ্ব তথ্যসমাজ সামিট, WSIS World summit for information society. বাংলাদেশের সে সময়কার প্রধানমন্ত্রী সেখানে যোগদেন। কথা হয় ২০০৫ সালে আবার এর ফলোআপ হবে। সেই ফলোআপের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তুতির জন্য একটি আয়োজন করা হল নভোথিয়েটারে – রোড টু তিউনিসিয়া।

সে সময় আমি জাতিসংঘের একটি প্রজেক্টের জাতীয় প্রকল্প সমন্বয়কারী হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কাজ করি। ইন্টারনেটে বিভিন্ন ফোরামে ঘুরে বেড়াই এবং ওপেন সোর্সের সত্যিকারের প্রেমে পড়েছি। আইওএসএন নামে একটি আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের মেম্বার। তো সেই চিন্তা থেকে বাংলাদেশ মুক্ত দর্শনের একটা নেটওয়ার্ক করার কথা ভাবছি। খোঁজ নিয়ে জানলাম দেশে মুক্ত সফটওয়্যার নিয়ে অলরেডি অনেকে কাজ করছে। যোগাযোগ করে পেলাম অংকুর, বায়োস আর একুশে নামের তিনটি সংগঠন। ঠিক করলাম তাহলে সবাই মিলে একটা প্ল্যাটফরম বানানো যাক। আলাপ করতে করতে রোড টু তিউনিসিয়া এসে পড়ল।

আমাকে বলা হল ঐ মেলায় একটা ওপেন সোর্স কর্নার করে দেওয়া হবে যদি সেটা চালানোর দায়িত্ব আমরা নেই। আমরা মানে আমি, অংকুর, একুশে ও বায়োস। আমরা রাজী হলাম এবং একটা স্টল হল।

২০০৫ সালের ২৪ অক্টোবর ঢাকার নভো থিয়েটারে আমার প্রথম সামনাসামনি দেখা হল অংকুরের জামিল আহমেদ ও মাহে আলম খান, বায়োসের মামুন, একুশের অমি আজাদের সঙ্গে। শুরু হল বিডিওএসএনের যাত্রা। শুরুতে এটি কোন প্রতিষ্ঠানিক সংগঠন ছিল না। এটি ছিল কয়েকটি সংগঠনের প্লাটফর্ম। পরে বোঝা গেল আলাদা আলাদা সংগঠনের আমব্রেলা সংগঠনের চেয়ে নিজেদের সংগঠন হওয়া ভাল তখন থেকে এটি একট সংগঠন হিসাবে কাজ করছে। তবে, অন্যান্য সংগঠনের সঙ্গ যৌথভাবে কাজ করার ব্যাপারটি অব্যাহত রয়েছে এবং এটি এখন অনেক বেড়েছে। শুরুতে এর কোন কমিটি ছিল না। কিন্তু যখন ঠিক হল এটি যৌথ এবং আলাদাভাবে কাজ করবে তখন একটা কমিটির প্রয়োজন হল। জাফর ইকবাল স্যারকে সভাপতি আর আমি সাধারণ সম্পাদক হয়ে একটা প্রাতিষ্ঠানিক কমিটি করা হল।

ততোদিনে কিন্তু আমাদের দুইটি সংঘটন। গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি এবং ব্যাকডোরে এসপিএসবি। গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি অনেক বড় ব্যাপার এবং সেখানে ঠাট্টা-মশকরার সুযোগ নেই। কাজে কালক্রমে বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন)  হয়ে গেল আমাদের যত সংগঠন, কর্মসূচী বা উদ্যোগ রয়েছে তার সবের কেন্দ্রবিন্দু।

এই সংগঠনটির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এমনভাবে আমরা ঠিক করেছি যে এটি তারুণ্যের প্রায় সব ধরণের কার্যক্রমকে ধারণ করতে পারে। তরুণ যেহেতু একা কিংবা কেবল একটা পথে চলে না, সবাইকে নিয়ে এগুতে চায় তাই এ সংগঠনের মূলমন্ত্র হলো শেয়ারিং। দর্শন হল মুক্ত দর্শন। আমরা বলতে শুরু করলাম – শেয়ারিং নলেজ ইজ পাওয়ার। প্রথমদিকে আমাদের কাজ হল উবুন্টুকে জনপ্রিয় করা। সেটিই আমরা নানানভাবে করতে থাকলাম। বইমেলাতে উবুন্টুর সিডি উন্মোচন করা, এনটিভিতে সফটওয়্যার ফ্রিডম ডে পালন করা সবই আমরা শুরু করলাম। একটা ঝামেলাও হল।

অনেকে মুক্ত দর্শনকে মুক্ত সফটওয়্যারের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন। আসলে মুক্ত বা ওপেন সোর্স সফটওয়্যার হল মুক্ত দর্শনের সফটওয়্যার। সফটওয়্যারের কারনে অনেকে ভাবেন এটি বুঝি কেবল সিএসই শিক্ষার্থী বা কম্পিউটার প্রকৌশলীদের সংগঠন! আসলে তা নয়। কিন্তু শুরুতে এদের সংখ্যাধিক্য ছিল। এখনও বিডিওএসএনে তাদের সংখ্যাধিক্য রয়েছে দুটি কারণে। এক নম্বর কারণ হল তথ্যপ্রযুক্তি ছাড়া এযুগের তরুণদের এগিয়ে যাওয়াটা কঠিন। তথ্য প্রযুক্তির নতুন সবকিছু আয়ত্বে রাখার কাজটাতে তাদের একধরণের প্রাধান্য থাকে। থাকার কথাই। আর দ্বিতীয় কারণ হল আমরা যারা শুরু করেছিলাম তারা সবাই কমবেশি তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত। এখন অবশ্য বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষার্থীরা এর সঙ্গে জড়িত।

এই সময় আমাদের রাগিব আমাকে প্রায়শ মেইল করতো যাতে বাংলা উইকিপিডিয়ার ব্যাপারটা আমি মাথাতে নেই। বিডিওএসএন হওয়ার পর রাগিব বলে- এখনতো প্ল্যাটফর্ম হয়েছে কাজেই বাংলা উইকি হোক। ২০০৫ সালের ২৫ মার্চ আমি আর রাগিব মিলে বাংলা উইকি নামে একটা ইয়াহু মেইলিং লিস্ট খুললাম, ৩০ মার্চ প্রজন্ম ডট কমে লিখলাম এবং ৭ এপ্রিল বাংলা উইকিপিডিয়াতে তথ্য যোগ করার জন্য প্রথম আলোর বন্ধুসভার রুমে একটা মিটিং করলাম। সেই সভাতে “আরো উপস্থিত ছিলেন মাহে আলম খান, তামিম শাহরিয়ার প্রমূখ”। সেই বাংলা উইকি এখন আলাদা সংগঠন হয়েছে।

বিডিওএসএনের নিয়মিত কার্যক্রমের কয়েকটি-

ক. সক্ষমতার উন্নয়ন- একুশ শতকের লড়াই-এ জিততে হলে দক্ষ আর সক্ষম হতে হবে। আমাদের কর্মকাণ্ডের বড় অংশ জুড়ে তাই রয়েছে ক্যাপাসিটি বিল্ডিং। সেমিনার, প্রশিক্ষণ, বুট ক্যাম্প, কর্মশালা- নানান বিষয়ের, নানান ধরণের। উদ্দেশ্য একটাই দক্ষ মানবসম্পদ।

খ. মুক্ত কন্টেন্টের বিকাশ ও প্রসার- মুক্ত কন্টেন্টের সবচেয়ে বড় উদাহরণ হল উইকিপিডিয়া। বিডিওএসএনের একটি কাজ হলো উইকিপিডিয়াকে এগিয়ে নেওয়া। এজন্য ক্যাম্পেইন, শোভাযাত্রা, সমাবেশ, লেখালেখি যেমন করা হয় তেমনি উইকি ক্যাম্প ইত্যাদির মাধ্যমে উইকিকে কাজ করার স্বেচ্ছাসেবী তৈরিতে কাজ করা হয়। ২১ ফেব্রুয়ারি আর পহেলা বৈশাখের সমাবেশ এখন এই ক্যাম্পেইনের দুইটি বাৎসরিক প্রোগ্রাম যা গত ৮ বছর ধরে হচ্ছে।

গ. মুক্ত সফটওয়্যার প্রচার, বিতরণ, লোকালাইজেশন- মুক্ত সফটওয়্যার বিতরণের কাজটি করা হয়। যদিও লোকালাইজেশনের কাজ ইদানিং ঝিমিয়ে পরেছে অনেকখানি।

ঘ. প্রযুক্তি মেলা – বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেসব প্রযুক্তি মেলার আয়োজন করে বিডিওএসএন তার সঙ্গে যুক্ত থাকতে ভালবাসে।

ঙ.উদ্যোক্তা উন্নয়ন – তরুন সমাজকে আত্মকর্মসংস্থানে উদ্বৃদ্ধ করার জন্য বিডিওএসএন কাজ করে। ২০০৬-২০০৭-এর দিকে ফ্রিল্যান্স আউটসোর্সিংকে জনপ্রিয়করার জন্য বিডিওএসএন যে কর্মকাণ্ড শুরে করে সেটা এখন নানান দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। বতর্মানে আধুনিক পেশাজীবী তৈরি করার জন্য কাজ করছে এই সংগঠন। এ ব্যাপারে আমাদের একটি আন্দোলনের নাম চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব

চ. তামাক (মাদক) বিরোধী কর্মকাণ্ড – বিডিওএসএন যেহেতু তারুণ্যের বিকাশ চায় সেহেতু যা যা তারুণ্যকে ধ্বংস করে তার বিরোধীতা করে। দেশের বেশ কটি বিশ্ববিদ্যালয়কে তামাকমুক্ত ক্যাম্পাস ঘোষণা এবং সেটিও বাস্তবায়ন করার জন্য কাজ করেছে বিডিওএসএন।

ছ. প্রোগ্রামিং-এর প্রসার- কম্পিউটার প্রোগ্রামিঙের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর একটা কাজ আমরা করি। এটা জোরদার হয়েছে ২০০৪-২০০৫ সালে। তবে, আগে থেকে প্রোগ্রামিং আড্ডা বলে একটা ব্যাপার আমরা চালু করেছি। মাঝে মধ্যে এখনো হয়। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জাতীয় হাইস্কুল প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা। এবছর শুরু করবো অল গার্লস প্রোগ্রামিং কনটেস্ট।

জ. এছাড়াও এর আরো কিছু কার্যক্রম রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রোগ্রামের সঙ্গেও আমাদের সম্পৃক্তি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জরুরী হল টেইক ব্যাক দ্যা টেক নামে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইসিটির ব্যবহার বিষয়ক ক্যাম্পেইন। বিশ্বের ৩৬ নম্বর দেশ হিসাবে আমরা এই ক্যাম্পেইনে যুক্ত আছি। আমাদের আর একটা উদ্যোগ হচ্ছে কপিসাউথ নামের একটি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ততা। এটি দক্ষিণের দেশগুলোতে উত্তরের মেধা সন্ত্রাসের বিরোধিতা করে।

সংগঠনের একটা নির্বাহী কমিটি আছে। সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ১১ জনের একটি কমিটি। এখানে দেখা যাবে। এছাড়া সারাদেশে অনেক নিস্ক্রিয় ও কয়েকটি সক্রিয় নেটওয়ার্ক আছে যা আবার সচল করার চেষ্টা হচ্ছে।

বিডিওএসএনের ট্যাগ লাইন – স্বাধীনতার জন্য সব প্রজন্মকে রুখে দাড়াতে হয়েছে। এখন আমাদের পালা।

সংগঠন সংগীত – কাজি নজরুলের কারার ঐ লোহ কপাট।

অফিস – ২১০/২ এলিফেন্ট রোড, কমিউনিটি ফ্লোর, কক্ষ নং-১১০, ঢাকা।

বিডিওএসএন কোন এনজিও নয় এবং এটি দেশে বা দেশের বাইরে থেকে কোন  এখনও কোন প্রাতিষ্ঠানিক ফান্ড নেয়নি। সদস্যদের চাঁদা এবং কখনো কখনো কিছু স্পন্সরশীপের বেঁচে যাওয়া অর্থ দিয়ে এর কাজ চলে। কাজে যুক্ত হলে নিজের গাঁটের পয়সা খরচ হবে এটি নিশ্চিত!

 

Leave a Reply Cancel reply

Exit mobile version