সাড়ে তিনশ বছরের পুরাতন মসজিদে

৪ মে ২০২৬ তারিখে একদিনের সফরে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গিয়েছিলাম। সকালে কমলাপুর থেকে সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটের মহানগর প্রভাতীতে উঠি। মহানগর ট্রেনটি চালু হয় এরশাদের আমলে, গত শতকের আশির দশকে। সে সময় আমি দেশের সবচেয়ে বড় গ্রাম থেকে বুয়েটের বাঁশবাগানে এসে উঠেছিলাম। মন খারাপ হলেই মায়ের কাছে চলে যেতাম। সেজন্য মহানগর প্রভাতী, মহানগরপূরবী, উর্মিঅরুণা ও উর্মি গোধুলীতেই ছিল আমার নিয়মিত যাতায়াত। এখন অবশ্য মহানগর প্রভাতী ও মহানগর গোধূলী নামে দুটি ট্রেন ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে চলাচল করে।
প্রমি আমাকে আগেই বলে দিয়েছিল, এই ট্রেন কখনো সময়মতো ছাড়ে না। বাস্তবেও তাই পেলাম। সকাল ৭টা ৪৫ মিনিটের ট্রেন ছাড়লো প্রায় ৮টা ৫০ মিনিটে! কাজেই গন্তব্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসে পৌঁছাতেই বেশ বেলা হয়ে গেল। উদ্দেশ্য ছিল বিডিওএসএন ও ব্র্যাক ব্যাংক তারার “আমরাই তারা” প্রশিক্ষণ কর্মশালায় যোগ দেওয়া। ভেন্যুটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিশ্ববিদ্যালয় ভবনের ঠিক পেছনে।
দুপুরে জোহরের নামাজের সময় খোঁজ করলাম, কাছাকাছি কোনো ঐতিহাসিক মসজিদে যাওয়া যায় কি না। দেখলাম ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বেশ কয়েকটি পুরোনো মসজিদ এখন সম্প্রসারণ ও সংস্কারের মাধ্যমে বড় আকারে বিদ্যমান। গুগল ব্যাটা জানালো ভাদুঘর শাহী মসজিদ খুব কাছে। সেখানেই রওনা দিলাম।
তবে বাইরের বিশাল অবয়ব দেখে মনে মনে একটু ভয়ও পেলাম। নরসিংদীর বেলাবোর অনেক পুরোনো মসজিদের মতো হয়তো মূল স্থাপনাটি ভেঙে নতুন করে বানানো হয়েছে! কারণ বাইরে থেকে দেখলে এটি এখন বেশ বড় এক আধুনিক মসজিদ কমপ্লেক্স।
মসজিদের দেওয়ালঘেঁষা রাস্তা দিয়ে পূর্ব দিকে এগোতেই একটি বড় পুকুর চোখে পড়লো। সতর্কবার্তা দেখে বুঝলাম মুসল্লিরা এখানেই ওজু করেন। আমি গিয়েছিলাম দুপুর দুইটার দিকে। তখন দু-একটি ঘাটলা চোখে পড়লো। একটি আবার বেশ নতুন। মসজিদের পূর্ব দিকে বড় একটি খোলা মাঠ। সম্ভবত ঈদের জামাত হয় সেখানে। মাঠসংলগ্ন কিছু অংশ ঢালাই করে খোলা নামাজের জায়গার মতো তৈরি করা হয়েছে।
মসজিদের প্রবেশপথের কাছাকাছি কয়েকজন স্কুলপড়ুয়া ছেলের সঙ্গে দেখা হলো। তারা আমাকে ওজুখানার পথ দেখিয়ে দিল। মসজিদের উত্তর দিকে আলাদা করে বড় ওজুখানা নির্মাণ করা হয়েছে। একসঙ্গে অনেক মানুষ ওজু করতে পারেন। ওজুখানায় যেতে যেতে দেখলাম উত্তর দিকেও আরও একটি পুকুর আছে। সেটিও মসজিদ কমপ্লেক্সের অংশ। কমপ্লেক্সে এখন একটি মাদ্রাসা ও একটি হেফজখানাও রয়েছে। সব মিলিয়ে এটি এখন শুধু একটি ঐতিহাসিক মসজিদ নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় ও শিক্ষাকেন্দ্রিক কমপ্লেক্স।
ওজু করে মসজিদে ঢুকলাম। খিলানাকৃতির প্রবেশপথ। পুরো পূর্বদিকের দেওয়ালই খিলানধর্মী নকশায় নির্মিত। ঢুকতেই ছোট্ট এক ধরনের বারান্দা। তারপরই বেশ বড় নামাজঘর। সেখানে প্রায় ১২-১৩টি কাতারে মুসল্লি দাঁড়াতে পারেন। পর্যাপ্ত ফ্যান রয়েছে। ভালো লাগলো যে দুই পাশজুড়ে অনেক জানালা রাখা হয়েছে, ফলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা ভালো। তবে দেওয়াল ও মেঝে এখন পুরোপুরি টাইলসে আবৃত।
দুরুদুরু বক্ষে এগিয়ে গেলাম। না, মুঘল আমলের মূল মসজিদটি এখনো অক্ষত আছে!
বাইরে থেকে দেখেছিলাম, এখানে একটি মাত্র বড় গম্বুজ। ভেতরে মূল অংশটিতে পাঁচটি কাতারে কমবেশি ৫০-৬০ জন মুসল্লি নামাজ পড়তে পারেন। হিসাব করলে প্রায় ২০-২২ ফুটের একটি বর্গাকার নামাজকক্ষ দাঁড়ায়। এতে বাংলা পিডিয়ার তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
মূল অংশে একটি মাত্র মিহরাব। সেটি সামনের দিকে খানিকটা প্রক্ষিপ্ত। দেওয়ালগুলো বেজায় পুরু — পাঁচ থেকে ছয় ফুট হবে। বুঝলাম এগুলো পাথরের নয়, ইটের তৈরি। মোটা দেওয়ালের কারণও স্পষ্ট — এই দেওয়ালই গম্বুজের বিশাল ভার বহন করে।
ওপরে তাকিয়ে বড় আকারের গম্বুজটি বোঝা গেল। মুঘল আমলের মসজিদের সাধারণ বৈশিষ্ট্য এখানে এখনো টিকে আছে। চার কোণার দিক থেকে খিলানের মতো গম্বুজের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিচ থেকে তাকালে অনেকটা আটকোণা আকৃতি মনে হয়। পরে ঢাকায় ফিরে বাংলা পিডিয়া দেখে জানলাম, গম্বুজের ভার বহনের জন্য এখানে স্কুইঞ্চ ও বাংলা পেন্ডেন্টিভ—দুই ধরনের স্থাপত্য কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ চৌকো কক্ষ থেকে গোলাকার গম্বুজে উত্তরণের জন্য বাংলার নিজস্ব ইটনির্ভর স্থাপত্যরীতির সঙ্গে মুঘল প্রকৌশলের এক চমৎকার সংমিশ্রণ দেখা যায়।
মোটা দেওয়ালের কারণে মূল নামাজঘরটি এখনো বেশ ঠান্ডা। বাইরে প্রচণ্ড গরম থাকলেও ভেতরে এক ধরনের নরম, স্তব্ধ শীতলতা টের পাওয়া যায়। কয়েক শতাব্দী আগে নির্মিত স্থাপনাগুলো যে শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, প্রকৃতি ও আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেও নির্মিত হতো—ভাদুঘর শাহী মসজিদ তার একটি চমৎকার উদাহরণ।
নামাজ পড়ে বের হলাম। পুরো এলাকাটি হেঁটে দেখলাম। ওজুখানাতেই প্রথম খেয়াল করেছি, মেয়েদের জন্য আলাদা কোনো ব্যবস্থা নেই। মসজিদেও তেমন কোনো ঘেরা জায়গা দেখলাম না।
চলে আসার সময় একজন মুরব্বীর সঙ্গে দেখা হলো। জানতে চাইলাম, মসজিদে মহিলাদের জন্য কোনো আলাদা ব্যবস্থা আছে কি না।
তিনি বেশ রাগই করলেন। রেগেমেগে জানালেন, এরকম কোনো ব্যবস্থা এখানে নেই!
অটো পাল্টে ফিরতে ফিরতে মনে হলো, ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে নতুন করে টাইলস দিয়ে ঢেকে দেওয়ার বুদ্ধিটা আসলে কার?