পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়-১

Spread the love

বিপ্লব আসতি আছে, বানের জলের লাহান

ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ কী বিক্রি করেন?

  • আমার কোনো কোনো বক্তৃতায় আমি এই কথাটা জনতে চাই। অনেকে বলতে পারে না, আবার অনেকেই পারে। ফেসবুক আসলে বিক্রি করে আমাকে, তোমাকে কিংবা আমাদের সম্পর্ককে।

আজ থেকে মাত্র ৩০ বছর আগে আমার অজান্তে আমাকে বিক্রি করে দেবে এমনটা কী সম্ভব ছিল? এবং তাতে আমি সায়ও দেবো? অন্তত বিরোধিতা করবো না?

২০১৫ সালে ফেসবুক বাংলাদেশ বন্ধ ছিল, ২২ দিন। প্রায় সব মিডিয়া এটা নিয়ে রিপোর্ট করেছে, মন্ত্রীদেরকে ব্যাখ্যা দিতে হয়েছে, এক মন্ত্রীকেতো পত্র-পত্রিকায় আর্টিকেল লিখে নিজের সাফাই গাইতে হয়েছে। কেন?

আমরা কি লক্ষ্য করছি আমাদের সামনে এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে? ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা ক্লাউস শেয়াইব বলছেন আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে। তিনি এটিকে প্রগতি বলছেন না, বলছেন বিপ্লব।

তার হিসাবে প্রথম শিল্প বিপ্লব হলো বাস্পীয় ইঞ্জিন। পানি আর বাস্পের ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি। দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লব হলো বিদ্যুৎ ব্যবহার করে গণ উৎপাদন। তৃতীয় শিল্প বিপ্লব হলো ইলেকট্রনিক্স আর ইনফরমেশন টেকনোলজিকে কেন্দ্র করে এখন যা ঘটছে তাই। এটি শুরু হয়েছে গেল শতকের মাঝামাঝি সময়ে যখন ট্রানজিস্টর আবিস্কৃত হয়। আর এই তৃতীয় বিপ্লবের ওপর ভর করেই এখন একটি নতুন বিপ্লব, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সূচনা হয়েছে। এ হচ্ছে প্রযুক্তির এক ধরনের মিথস্ক্রিয়া যার ফলে ভৌত জগৎ, ডিজিটাল জগৎ আর জীবজগতের মধ্যে  পার্থক্যটা হয়ে যাচ্ছে বায়বীয়।
এটিকে তিনি তৃতীয় বিপ্লবের এক্সটেনশন হিসাবে মানতে নারাজ। কারণ গতি বলেন, স্কোপ বলেন কিংবা প্রভাব বলেন – কোনটাই তৃতীয়টির ধারে কাছে নেই। একেবারে অন্যরকম। এবং তার সঙ্গে আমিও একমত (ভাবখানা এমন যে আমি না জানি কে!!! হিহিহিহি)। বর্তমানের এই যে উলম্ফন এটার কোন ঐতিহাসিক উদাহরণ নাই। বলা যায় এ পরিবর্তন হচ্ছে জ্যামিতিক হারে। আর এই পরিবর্তন আসলে প্রভাবিত করবে আমাদের জীবনের ৩৬০ ডিগ্রীকেই।

আমি যখন বুয়েটে পড়তে আসি, প্রথমদিন আমাদের কম্পিউটার সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কাঁচ দিয়ে ঘেরা কয়েকটা বড় বড় বাক্স দেখিয়ে বলা হয়েছে এই হচ্ছে মেইনফ্রেম কম্পিউটার। সেটির কম্পিউটিং ক্ষমতা আজকের একটা মোবাইল ফোনের চেয়েও কম! এর ফলাফল কী হবে? (আমার বুয়েট জীবনের কথা লিখেছি আমার পড়ো পড়ো পড়ো বইতে)

কয়েকশ কোটি লোকের মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংযুক্ত থাকা, অকল্পনীয় প্রসেসিং আর স্টোরেজ ক্ষমতা এবং সহজে জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশাধিকারের ফলে কোথায় যে সভ্যতা যাবে তা চিন্তা করাটাও কঠিন। কারণ উন্মোচিত হয়ে গেছে এক নতুন দুনিয়া। প্রতিনিয়তই নিত্য নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাবে সবকিছুতে একটা ভ্যাবাচ্যাকা লেগে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ইন্টারনেট অব থিংস, নিজে চলা গাড়ি, ত্রিমাত্রিক প্রিন্টিং, ন্যানোটেকনোলজি, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, বায়োটেকনোলোজি, ম্যাটেরিয়াল সায়েন্স, শক্তি সঞ্চয় কিংবা কোয়ান্টাম কম্পিউটিং। কোনটা রেখে কোনটার কথা বলবো।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নানান রূপতো আমরা হর-হামেশাই দেখতে পাচ্ছি। গুগলকারের বিজ্ঞাপন চিত্রটা  দেখেছেন? এখন দেখেন সফটওয়্যার আছে যা কীনা বলতে পারে কোন শেয়ারে আপনি বিনিয়োগ করবেন (বাংলাদেশের শেয়ার বাজার বাদ) কিংবা এক ভাষার লেখা অন্য ভাষায় অনুবাদ করে দিচ্ছে (রবীন্দ্রনাথের চীনা অনুবাদ কিন্তু নয়!)। ড্রোন দিয়ে ডেলিভারিও শুরু হয়ে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যৌক্তিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অসম্ভব  ক্ষমতা সম্পন্ন কম্পিউটিং পাওয়ার। এগুলো আমাদের কল্পবিজ্ঞানের জগতে নিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বায়োলজিক্যাল জ্ঞান আর মিথস্ক্রিয়া। হিউম্যান কম্পিউটার ইন্টারেকশন নামে একটা নতুন বিজ্ঞানতো চালুই হয়ে গেছে। এলান তুরিনের সেই মেশিন মনে হয় এখন আর বেশি দূরে নয় যা কী না মানুষকে বোকা বানাতে পারবে!

এরই মধ্যে হাজির হয়েছে ইন্টারনেট। এমন মাধ্যম যা নিমেষে হাজার হাজার লোকের কাছে চলে যাচ্ছে। ৫ কোটি লোকের কাছে রেডিওর পৌছাতে লেগেছে ৩৮ বছর, টেলিভিশনের ১৩ বছর। অথচ ইন্টারনেটের লেগেছে ৪ বছর। আইপডের জন্য সময়টা মাত্র ৩ বছর আর ফেসবুকের? ২৪ মাস!

শিল্পবিপ্লবের পর একটা জটিল সাপ্লাই চেইন গড়ে উঠেছিল – নকশা থেকে উৎপাদন, পন্য বিতরণ, আমদানীকারক, পাইকারি আর খুচরা বিক্রেতার সমন্বয়ে। এর ফলে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে শত কোটি ধরণের পন্য উৎপাদনের, বিপননের এবং তা পৌছে যাচ্ছে ভোক্তার দুয়ারে। পড়ালেখার পদ্ধতিরও পরিবর্তন হয়েছে। সাপ্লাই চেইন ম্যানেজ করার লোক তৈরি করতে উঠে পড়ে লেগেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। মৌলিক বিজ্ঞানের চেয়ে বিবিএ/এমবিএ নামক জ্যাক অব অল ট্রেডের  ডিগ্রীর দাম বেড়েছে।

ইন্টারনেটের আবির্ভাবের ফলে এই ব্যবস্থাটারই এক অভাবনীয় পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। হাভাস মিডিয়ার সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট টম গুডউইন এভাবে এটার বর্ণনা করেছেন – বিশ্বের সবচেয়ে বড় ট্যাক্সি কোম্পানি উবারের নিজের কোন ট্যাক্সি নেই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিডিয়া ফেসবুক কোন কন্টেন্ট তৈরি করে না, পৃথিবীর সবচয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাইকার আলীবাবার কোন গুদাম নাই। এবং বিশ্বের সবচেয়ে বড় আবাসন প্রোভাইডার এয়ারবিএনবির কোন রিয়াল এস্টেট নাই। (Uber, the world’s largest taxi company, owns no vehicles. Facebook, the world’s most popular media owner, creates no content. Alibaba, the most valuable retailer, has no inventory. And Airbnb, the world’s largest accommodation provider, owns no real estate.)

সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

আগের বিপ্লবগুলোর মতো এই বিপ্লবও পৃথিবীর মানুষদের আয় বাড়ানো এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে এক নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে, এই সুযোগ হবে তাদের জন্য যাদের এই নতুন জগতে অবারিত প্রবেশাধিকার থাকবে, যারা এর সুফলটা নিজের ঘরে তুলতে পারবে। এই মুহুর্তে বিশ্বের যদি ১ থেকে ১০ জন শীর্ষধনীর হিসাব নিলে দেখা যাবে তাদের বেশিরভাগই তথ্য প্রযুক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আর তাদের সৃষ্ট প্রযুক্তির কারণে জীবনকে উপভোগ করার দক্ষতাও আমাদের বেড়ে গেছে অনেক। গণিত উৎসবে চট্টগ্রাম যাওয়ার বিমান টিকেট কাটতে আমাকে মাত্র কয়েকটি ক্লিক করতে হয়েছে। শুধু টিকেট কাটা নয়, যে কোন বিষয় কেনাকাটা করা, পেমেন্ট করা, গান শোনা, সিনেমা দেখা কিংবা প্রবাসী বন্ধুর সঙ্গে গেম খেলা – সবই এখন সম্ভব কোথাও না গিয়ে!

সামনের দিনে সাপ্লাই সাইডেও অভূতপূর্ব সব উন্নতি হতে পারে। পরিবহন আর স্থানান্তরের খরচ অনেক কমে যাবে, গ্লোবাল লজিস্টিক চেইন হবে মুখ্য এবং বাণিজ্যের খরচ কমে আসবে শূন্যের কোঠায়। কী হবে তখন?
আমি জানি না। নতুন নতুন মার্কেট আর পন্যে যে সবকিছু সয়লাব হয়ে যাবে সেটা অবশ্যই বলা যাবে।

তবে, সব যে ভাল হবে তা কিন্তু বলা যাবে না। মেশিনের উত্থানের ফলে লেবার মার্কেটে নানান বিপর্যয় দেখা দিতে পারে। উন্নত এবং পরিবর্তন প্রয়াসী দেশগুলোতে আইট জানা, কারিগরি দক্ষতার চাহিদা বেড়ে যাবে। ফলে, অদক্ষ এবং সেমি-দক্ষ লোকের চাহিদা কমে যাবে। (আমাদের দেশের অদক্ষতার খেসারতও তখন কিন্ত বাড়বে।  বিপদটা কী আমরা টের পাচ্ছি)। সম্পদের বিতরণ নতুন অসাম্য তৈরি করতে পারে।

এটার প্রকাশ আমাদের দেশেও দেখছি।একটি এপস কোম্পানিকে আমি ভেঙ্গে যেতে দেখেছি কারণ বয়স্ক এমবিএ ডিরেক্টর তার হাটুর বয়সী সিটিওর বেতন মেনে নিতে পারে নাই। এটা কিন্তু একটা ইনডিকেশনও যে, বয়সের চেয়ে তারুন্য এবং সম্পদের চেয়ে মেধাই হয়তো মুখ্য হয়ে উঠতে পারে উৎপাদনের। ফলে চাকরি বাজারে কমদক্ষ/কম টাকা এবং বেশি দক্ষ/বেশি টাকা সিনারিওর জন্ম হতে পারে। তখন কি নতুন করে দেখা যাবে শ্রেণি বৈষম্য?

একুশ শতকের টাইম সাময়িকীর প্রথম প্রচ্ছদে ছিল একটি মানুষের মস্তিস্কের ছবি। বোঝানোর জন্য যে, একুশ শতকের ক্যাপিটাল হবে জ্ঞান, নলেজ। এবং মাত্র ১৫ বছরের মধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি কারা ক্রমশ শক্তিশালী হয় উঠছে। ওইসিডির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যারা তরুনদের পেছনে বিনিয়োগ করছে তারাই আগামীতে উঠে আসবে। সেখানকার ২০৩০ সালের একটা হিসাবে বলা হচ্ছে তখন ১০০ জন বিজ্ঞানীর তিন জন আসবে সৌদি আরব থেকে!!! ঠিক পড়েছেন সৌদি আরব থেকে। কারণ ওরা ওদের নতুন প্রজন্মের পেছনে জ্ঞান-বিনিয়োগে উঠে পড়ে লেগেছে।

আমরা চাই বা না চাই এক নতুন যুগের সন্ধিক্ষণে আমরা ক্রমাগত দাড়িয়ে যাচ্ছি। এক নতুন জমানার পায়ের আওয়াজ কিন্তু পাওয়া যাচ্ছে। ক্রমেই তার পদধ্বনি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
এই সময়ে আমরা কী কেবল হানাহানি, ভেদাভেদে মত্ত থাকবো নকি একযোগে ঝাপিয়ে পড়বো এক নতুন লড়াই-এ?
আমরা  তো জানি-

নতুন প্রজন্মের নানান কীর্তি

প্রমাণ খুজিয়া পাই

একাট্টা হলে বাঙ্গালির কাছে

অসম্ভব কিছুই নাই।

 

২০১৬ সাল সবার জন্য বয়ে আনুক নতুন দিনের লড়াই-এ জেতার রসদ।
সবার জীবন পাই-এর মতো সুন্দর হোক।

 

 

Leave a Reply Cancel reply

Exit mobile version