মার্বেল, কাঠি আর মৌলিক সংখ্যা

Spread the love

মরিয়ম মির্জাখানি স্কুল অব ম্যাথ এন্ড সায়েন্স-এর প্রথম কোহর্টের অভিজ্ঞতা

৫৭ সংখ্যাটা নিয়ে ওরা আটকে গেছে।

মৌলিক উৎপাদক বের করতে হবে। প্রথম দিকের সংখ্যাগুলো বেশ ভালই চলছিল। ২, ৩, ৫, ৭ – এদের কাউকে না কাউকে পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু ৫৭-এ এসে প্রায় সবাই থেমে গেল। একজন অবশ্য ছাড়লো না। সে নানাভাবে চেষ্টা করে একসময় বের করতে পারলো ৫৭-এর দুইটি উৎপাদক।

মনে হলো, আসলে এখান থেকেই শেখা শুরু। কারণ গণিতের অনেক ধারণাই তো মানুষের সামনে এসেছে ঠিক এইভাবে। কোনো সমস্যায় আটকে গিয়ে। তারপর সেই ঝামেলা থেকে বের হওয়ার জন্য কোনো প্যাটার্ন, শর্টকাট বা কোনো না কোনো নিয়ম আবিষ্কার করে।

পরদিন আমরা বিভাজ্যতার নিয়মে গেলাম। ২, ৫, ১০ – এগুলো দ্রুতই ওরা নিজেরা ধরতে পারলো। তারপর ধীরে ধীরে ৩। শুরুতে ৩ ওদের একটু সমস্যায় ফেলেছে। কিন্তু আসলান ঠিকই বের করতে পেরেছে প্যাটার্নটা। “ডিজিটগুলোর যোগফল তো ৩ এর মাল্টিপল” বললো সে।
তখন আবার ৫৭ সংখ্যাটা ফিরে এলো।
৫ + ৭ = ১২।
১ + ২ = ৩।
তাহলে ৫৭, ৩ দিয়ে বিভাজ্য!

ওদের চোখেমুখে তখন যে আনন্দ, সেটাকে “বিভাজ্যতার নিয়ম শেখা” বলে বর্ণনা করা যাবে না। বরং বলা যায় – একটা লুকানো দরজা হঠাৎ খুলে যাওয়া।

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর জন্য আমাদের নতুন উদ্যোগ –  মরিয়ম মির্জাখানি স্কুল অব ম্যাথ এন্ড সায়েন্স ফর প্রাইমারি স্টুডেন্ট -এর চিন্তা ও যাত্রা।

প্রথম কোহর্টে অংশ নেয় ১৬ জন পড়ুয়া। ঈদের আগের তিনটি দিন, প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তারা এই ছোট্ট স্কুলে সময় কাটিয়েছে। প্রতিদিন প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা করে গণিত ও বিজ্ঞান হয়েছে। মাঝখানে খাওয়া-দাওয়া, বিশ্রাম, হৈচৈ আর দুষ্টুমিও ছিল সমানতালে।

এই লেখাটা মূলত গণিতের অংশ নিয়ে আমার নিজের পর্যবেক্ষণ। প্রথম দিন পুরো গণিত সেশন এবং পরের দুইদিন আংশিক সেশন আমি নিয়েছি। পাশাপাশি আরও কয়েকজন মেন্টর জ্যামিতি, কাউন্টিং ও বিজ্ঞানের বিভিন্ন অংশ নিয়ে কাজ করেছেন। পুরো কোহর্টের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ নিয়ে পরে আমরা একটি বিস্তারিত রিপোর্ট প্রকাশ করার আশা রাখি।

গত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন অলিম্পিয়াড, ক্যাম্প আর গণিতবিষয়ক কার্যক্রম করতে গিয়ে একটা ব্যাপার আমাদের চোখে পড়ে। ছোট ক্লাসের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ, আগ্রহ এবং প্রস্তুতির জায়গায় যেন একটা পরিবর্তন এসেছে। একই সময়ে ক্যাঙ্গারু গণিত নিয়ে কাজ করতে গিয়ে জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন (NSA) রিপোর্টেও গণিতের অবস্থাটা খুব আশাব্যঞ্জক মনে হয়নি।

তবে সংখ্যাগুলো দেখেই আমরা এই স্কুল শুরু করিনি।

বরং প্রশ্নটা ছিল অন্যরকম — ছোটদের জন্য কি এমন একটা STEM learning environment তৈরি করা যায়, যেখানে তারা ভয় বা মুখস্তের চাপে না থেকে নিজেরা আবিষ্কার করতে করতে শিখবে।

আমরা ভাবলাম, ছোটদের গণিত ও বিজ্ঞান শেখানোর ক্ষেত্রে “সংজ্ঞা” থেকে না শুরু করে “অভিজ্ঞতা” থেকে শুরু করলে কেমন হয়?

“ইহাকে অমুক বলে” — এই পথটা একটু এড়িয়ে গিয়ে যদি তারা আগে সমস্যাটা অনুভব করে, প্যাটার্নটা দেখে, হাতে-কলমে কিছু করে, তারপর সংজ্ঞায় যায়?

সেই চিন্তা থেকেই এই ছোট্ট পরীক্ষার শুরু।

২.

শুরু থেকেই আমরা ঠিক করেছিলাম, ক্লাস যতটা সম্ভব হাতে কলমে হবে। ওদেরকে সমস্যাতে ফেলা হবে যাতে ওরা নিজেরাই সমাধান বের করতে পারে। আমাদের কাজ হবে কিছু ক্লু দেওয়া, ওদের চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ করা।
তাই প্রথম দিনেই গণিতের ক্লাসে আমি হাজির হলাম মার্বেল, কাঠি আর কাগজ নিয়ে।

বড় সংখ্যা গোনার সময় ওরা নিজেরাই আবিষ্কার করলো – ১০টা করে কাঠি বেঁধে রাখলে গোনা অনেক সহজ হয়। কিছু সংখ্যা সহজে ছোট ছোট সমান দলে সাজানো যায়, আবার কিছু সংখ্যা বেশ একগুঁয়ে। তারা কোনোভাবেই সমান দলে ভাগ হতে চায় না। সেখান থেকেই মৌলিক সংখ্যার ধারণা। মৌলিক সংখ্যা খোঁজার জন্য গ্রীক গণিতবিদ ইরাটোসথেনিসের ছাকনি। সেখান থেকে ওদেরকে কী সুন্দর গোল্ডবাখ কনজেকচারে নিয়ে যাওয়া গেল। যদিও নামটা আমরা বলিনি। তারপর ওরা চলে গেল প্রাইম ফ্যাক্টরাইজেশন – মৌলিক উৎপাদকে।

মজার ব্যাপার হলো, এই বিষয়গুলোর অনেক কিছুই ওদের আগে থেকে “জানা” ছিল।

আবার আমি যখন ১ থেকে ১০ পর্যন্ত সংখ্যার যোগফল জিজ্ঞেস করলাম, কয়েকজন সঙ্গে সঙ্গে ৫৫ বলে দিল। এমনকি ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত সংখ্যার যোগফল ৫০৫০ — এটাও কেউ কেউ জানতো। আমি খুবই অবাক হয়েছি। কারণ এটি তাদের জানার কথা নয়।

তাই একটু গভীরে গিয়ে টের পেলাম তারা যোগফল মুখস্ত করে রেখেছে। কীভাবে এই যোগফল এসেছে, সেটা জানে না। যখন সেটা দেখানো হলো তখন তারা নিজেরাই অবাক হয়ে গেল। আর আমি টের পেলাম আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মুখস্তের প্রতি যতো আগ্রহ তার চেয়ে “কেন এটা হলো” সেটা জানার আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু ঠিকমতো বোঝানো গেলে এটা উল্টে যেতে পারে।

মুখস্ত আর বোঝার মধ্যে ফারাকটা সম্ভবত এখানেই।

৩.

দ্বিতীয় দিনে ওরা বিভাজ্যতার নিয়ম “আবিষ্কার” করলো। আমরা নিয়ম বলিনি। বরং কিছু সংখ্যা লিখে জিজ্ঞেস করেছি – “কী দেখছো?”

ধীরে ধীরে ওরা নিজেরাই বুঝে ফেললো:

  ২ দিয়ে বিভাজ্য সংখ্যাগুলোর একক স্থানের অঙ্ক ০, ২, ৪, ৬ বা ৮ হয়;

  ৫ দিয়ে বিভাজ্য সংখ্যাগুলোর একক স্থানের অঙ্ক ০ অথবা ৫ হয়;

  ১০-এর ব্যাপারটা সহজেই বুঝে ফেলেছে।

৩-এর ক্ষেত্রে শুরুতে একটু ঝামেলায় পড়েছে। তারপর ১/২ জন ঠিকই দেখতে পেয়েছে “৩ দিয়ে বিভাজ্য সংখ্যাগুলোর অঙ্কগুলোর যোগফল ৩ দিয়ে বিভাজ্য!!! আমাদের কাজ ছিল মূলত তাদের পর্যবেক্ষণগুলোকে একটু সাজিয়ে দেওয়া।

সেদিনের আরেকটা মজার ঘটনা ছিল হোমওয়ার্ক নিয়ে। প্রথম দিনের হোমওয়ার্ক ছিল মৌলিক সংখ্যার ছাকনি, ১ থেকে ১০০ পর্যন্ত। হোমওয়ার্ক চেক করার পর ওদের বলা হলো কাগজটা দিয়ে প্লেন বানিয়ে উড়ানো যাবে। তারপর ওদের কাগজের প্লেন বানানো শেখানো হলো। ঘটনাটা এমন জায়গায় গেল যে, পরদিন ওরাই আবার হোমওয়ার্ক চাইলো — যেন আবার প্লেন বানানো যায়!

৪.

তৃতীয় দিনে আমরা লসাগুতে গেলাম।

কোনো শর্টকাট পদ্ধতি বা এলগোরিদম দিয়ে শুরু করিনি। বরং প্রতিটি সংখ্যার গুণিতক লিখতে শুরু করলাম। তারপর ওরা common multiple-গুলো বের করলো।  তারপর সেখান থেকে সবচেয়ে ছোটটাকে চিহ্নিত করলো।

আমাদের বিশ্বাস, মূল ধারণাটা বুঝে ফেললে শর্টকাট বা পদ্ধতি পরে নিজে থেকেই বোধগম্য হয়ে উঠবে।

৫.

এই তিনদিনে আরেকটা ব্যাপার খুব স্পষ্টভাবে চোখে পড়েছে। শিশুরা আমাদের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি পর্যবেক্ষণ করে। অনেক বেশি প্যাটার্ন ডিটেক্ট করতে পারে। তবে তারা সবসময় দ্রুত না।

মুমতাহিনা নামে তৃতীয় শ্রেণির একটি মেয়ে ছিল। খুব ধীর-স্থির। আস্তে আস্তে করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রায় সব কাজই করতে পারে। এমনকি অনেক দ্রুত উত্তর দেওয়া শিক্ষার্থীর থেকেও গভীরভাবে।

এটাও আমাদের জন্য একটা প্রণোদনা ছিল – দ্রুত উত্তর দেওয়া আর গভীরভাবে বোঝা সবসময় এক জিনিস নয়।

ঈদের ছুটির শুরুতে অভিভাবকদের সহযোগিতা ছিল অসাধারণ। প্রত্যকেই সকাল সকাল নিজের সন্তানকে স্কুলে দিয়ে গেছেন। একজন অভিভাবক বললেন, আগেরদিন তাঁর ছেলে বাসায় ফিরতে চায়নি, আরও সময় থাকতে চেয়েছে। আরেকজন বললেন, সারাদিনে বাচ্চাদের একবারও মোবাইলের কথা মনে হয়নি।

আমি যেহেতু তিনদিনই গণিত ক্লাসে কমবেশি যুক্ত থেকেছি, তাই শিশুদের শেখার ধরনটা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আমাদের সময় আমরা যেভাবে শিখতাম, এখনকার শিশুরা ঠিক সেভাবে শেখে না। ফলে নতুন করে বোঝার চেষ্টা করতে হচ্ছে — কোন approach কাজ করে? কোনটা করে না?

এখন পর্যন্ত অন্তত দুটো জিনিস পরিষ্কার হয়েছে:

  • উদাহরণ ও হাতে-কলমে কাজ থেকে সংজ্ঞায় যাওয়াটা অনেক বেশি কাজের এবং
  • আর প্যাটার্ন খুঁজতে দেওয়া।

গণিত ও বিজ্ঞান — দুটো ক্ষেত্রেই এগুলো কাজ করেছে।

এই ছোট্ট পরীক্ষাটা থেকে আমরা এখনো কোনো বড় সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে চাই না।

তবে এটুকু বুঝতে পেরছি, শিশুদের STEM শেখার ক্ষেত্রে আনন্দের সঙ্গে আবিষ্কারের জায়গাটা সম্ভবত আমরা অনেকদিন ধরেই অবহেলা করেছি। সেখানে যতো বেশি জোর দেওয়া যায় ততোই ভাল হবে।

এখন সামনে আমাদের কয়েকটা পরিকল্পনা আছে। আফটার-স্কুল কার্যক্রম হিসেবে এই স্কুল চালানোর ইচ্ছে আছে। আবার স্কুল ছুটির সময়ে বুটক্যাম্প মডেলটাও রাখতে চাই। অনলাইন cohort নিয়েও ভাবছি। মেন্টরদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণের পরিকল্পনাও আছে, কারণ ভবিষ্যতে শিক্ষক প্রশিক্ষণের মধ্যেও এই অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে যেতে চাই।

হয়তো পরে বইও হবে।

তবে আপাতত আমরা শিখছি।

শিশুদের কাছ থেকে।
তাদের ভুল থেকে।
তাদের হৈচৈ থেকে।
তাদের আবিষ্কার থেকে।

আর কখনো কখনো, ৫৭ সংখ্যাটার কাছ থেকেও।

 

Leave a Reply Cancel reply

তারায় তারায় খচিত

প্রাথমিক গণিতের ভিত্তি

শরবতে বাজিমাত

বিলিয়ন ডলার স্টার্টআপ

ইমোশনাল মার্কেটিং

Exit mobile version